No icon

বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী আমাদের অহংকার

 নূরুল আলম আবির

একাত্তরের রক্ত সাগর পেরিয়ে আমরা যে স্বাধীনতা পেলাম তার পেছনে বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীদের ত্যাগ পৃথিবীতে প্রচলিত কোনো পরিমাপক যন্ত্রে মাপা সম্ভব নয়। কারণ তাদের ত্যাগগুলো এত এত মহান ছিল, এত বেশী করুণ ছিল- তার পরিধি এ বাংলা তথা পৃথিবীর আকাশ-বাতাস ছাড়িয়ে মহাশূণ্যেও ডানা মেলেছে। সেই সব অনুপম মহানদের কাতারে যিনি অন্যতম, তিনি আমাদের বীরাঙ্গনা রমা দি তথা রমা চৌধুরী। গতকাল খু-ব  ভোরে, রাতের পর দিনের আলো ফোটার আগেই আমাদের না বলেই তিনি চলে গেলেন। ঐ সময় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটির সীমানাজুড়ে রাশি রাশি বেদনার বিলাপ খুব নীরবেই ঝরছিল। সে সময় অভিমান করে তিনি যে চোখ বুঝলেন, তা খোলে দিবেন এমন সাধ্য কার! 
হ্যাঁ তাই হলো। বহু ডাকাডাকির পরও তিনি আর চোখ মেললেন না। আমাদের স্বাধীনতা সূর্যের আলোক মিছিকে তাঁরও শত টুকরো কিরণ আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে এসব হতভাগ্য বীরাঙ্গনারাও নিজেদের দেহ-মন আর সব সৌন্দর্য খুশির অশ্রুতে ভাসিয়ে দিয়ে স্বপ্নের ঢালিতে পরম শ্রদ্ধায় আরাধনা করে ডেকেছেন, মুক্ত ডানার এ বাংলার স্বাধীনতাকে। পেলামও আমরা রক্তে রঙিন প্রিয় স্বাধীনতাকে। তবে এর জন্য আমাদেরকে বেশ চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল।

রমা দি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নিজের দুই ছেলের সাথে হারালেন হীরে তুল্য আপন সম্ভ্রম। সেদিন একাত্তরের ১৩ মে পুকুরে ঝাঁপিয়ে কোনো রকমে নিজেকে বাঁচালেন। কিন্তু তার স্বপ্ন নীড়ের বাড়িটি গান পাউডার দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা পুঁড়িয়ে ছাঁই করে দিয়েছিল। পাকিস্তানিরা এসব পারলেও তার অনুপম আত্মত্যাগের কাছে হেরে গেলো অবশেষে। আমাদের রমা দি ইতিহাসে আঙ্গুল উঁচিয়ে বেঁচে রইবেন, একজন ব্যতিক্রতী বীর নারী হয়ে। ছেলেকে যে মাটিতে তিনি নিজ হাতে পুঁতে দিলেন, অগণিত শহীদেরা যে মাটিতে পরম সুখে গভীর ঘুমে মগ্ন; সে মাটির উপর তিনি আর কোনোদিন জুতো পায়ে হাঁটেন নি! হাঁটেননি বলতে পারেননি, একাত্তরের শহীদ যোদ্ধাদের অবহেলা করতে।

একাত্তরের জননী, এক হাজার একদিন, যাপনের পদ্য এবং ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথসহ ১৯টি বই লিখে আমাদের রমা দি নিজেকে নিয়ে গেলেন অনন্য উচ্চতায়। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেন। লিখে গেলেন আপন কলমে অবিরাম। তিনি তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন গহীন বেদনামাখা ঘটনাগুলো জানিয়েছেন, 'একাত্তরের জননী' নামক বইটিতে। 

এই মুক্তির রাণী কখনো জীবন যুদ্ধে হার মানেন নি। নিজের কলমে মানবিকতা ধারণ করে, বলে গেলেন তিনি মহানুভবই ছিলেন। বীরাঙ্গনা হলেও তিনিই শ্রেষ্ঠ মানবী। নিজের লেখা বই ফেরি করে বিক্রি করে, তিনি সারা বাংলায় ছড়িয়ে দিলেন নিজের স্বপ্নের কথাগুলো। 

রমা দি নেই কে বলেছে! তিনি আছেন তাঁর অমর কীর্তিতে। 

লেখকঃ কবি ও সাংবাদিক

Comment As:

Comment (0)